অনেক প্রতিষ্ঠানে এআই এখন ব্যবসার প্রধান অগ্রাধিকার। প্রযুক্তিটির উত্থানে কর্মক্ষেত্রে নতুন দক্ষতা অর্জনের চাপ বাড়ছে। পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অনীহা বা ক্লান্তি থেকে অনেক অভিজ্ঞ প্রযুক্তিকর্মী নির্ধারিত সময়ের আগেই অবসরে যাচ্ছেন বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী ফরচুন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে একদিকে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় কমলেও অন্যদিকে অভিজ্ঞ জনশক্তি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রযুক্তি খাতে এআইকে ঘিরে দ্রুত পরিবর্তন অনেক কর্মীর জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। কেউ নতুন প্রযুক্তি শিখতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। আবার কেউ মনে করছেন, এআই নিয়ে অতিরিক্ত উৎসাহ বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে এসে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার পরিবর্তে অবসর বেছে নিচ্ছেন তারা।
প্রতিবেদনে প্রযুক্তি খাতের কর্মী কার্নসের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি আগে থেকেই অবসরের পরিকল্পনা করছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানে এআইকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া। তার ভাষায়, কোম্পানির প্রায় সব কাজই এআইকে কেন্দ্র করে এগোতে শুরু করে। তিনি এ পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে আর যুক্ত রাখতে চাননি।
কার্নস জানান, তিনি নতুন প্রযুক্তি শিখতে অক্ষম নন। চাকরি হারানোর ভয়ও তার ছিল না। কিন্তু ক্যারিয়ারের এ পর্যায়ে এসে এমন প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করতে তিনি আগ্রহী ছিলেন না, যার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তার আস্থা নেই। তাই তিনি অবসর নেয়ার পথ বেছে নেন।
অ্যালিয়ানজ লাইফের এক জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪২ শতাংশ চাকরিজীবী সময়ের আগেই অবসরে যান। যদিও দেশটিতে অবসরের গড় বয়স ৬২-৬৪ বছর। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছায় অবসরের কারণ ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে।
এমপ্লয়ি বেনিফিট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক ক্রেইগ কপল্যান্ড বলেন, ‘সাধারণত তিনটি কারণে চাকরিজীবীরা সময়ের আগে অবসর নেন। প্রথমটি শারীরিক অসুস্থতা। দ্বিতীয়টি পরিবারের সদস্যের দেখাশোনার দায়িত্ব। তৃতীয়টি কর্মক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন। বর্তমানে প্রযুক্তি শিল্পে এআই-ভিত্তিক পরিবর্তন তৃতীয় কারণকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি খাতের কর্মীদের অন্য অনেক পেশার তুলনায় নিয়মিত নতুন প্রযুক্তি শিখতে হয়। গত তিন দশকে ব্যক্তিগত কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মোবাইল প্রযুক্তি, ক্লাউড কম্পিউটিং ও এখন এআই—প্রতিটি ধাপেই নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হয়েছে। তাই ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে এসে আবারো বড় পরিবর্তনের মুখোমুখি হওয়া অনেকের কাছে কঠিন হয়ে উঠছে।
অবসর পরিকল্পনাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান রেইন ডগ ফাইন্যান্সিয়ালের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ ম্যাককনেল বলেন, ‘মহামারীর পর থেকেই স্বেচ্ছায় অবসর নেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। বাসা থেকে কাজের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত জীবনের অগ্রাধিকার বদলে যাওয়া ও আর্থিক বাজারের উন্নতির কারণে অনেকেই মনে করেন, চাকরি ছাড়ার জন্য এটাই উপযুক্ত সময়।’
তার মতে, প্রযুক্তি খাতের কর্মীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো তারা কি নতুন প্রযুক্তির ঢেউয়ে ফের যুক্ত হবেন, নাকি ক্যারিয়ার এখানেই শেষ করবেন। অনেকেই দ্বিতীয় পথটি বেছে নিচ্ছেন।
অর্থনৈতিক পরামর্শক কেভিন এস্টেস বলেন, ‘অবসর নেয়ার সিদ্ধান্ত সহজ নয়। কারণ একবার প্রযুক্তি খাত থেকে বেরিয়ে গেলে পরে ফিরে আসা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে এআই দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে কয়েক বছর পর এ খাতে ফিরে আসতে চাইলে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘অনেকেই মনে করেন এআইকে ঘিরে অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাদের ধারণা, এআই কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারলেও সব ধরনের সফটওয়্যার, কোড বা ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া প্রত্যাশামতো পরিচালনা করতে পারছে না। তাই এআই নিয়ে সবার উৎসাহ সমান নয়।’
তবে এ প্রবণতার নেতিবাচক দিকও রয়েছে। অভিজ্ঞ কর্মীরা দ্রুত অবসরে গেলে নতুনদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়ার মানুষ কমে যেতে পারে। ফলে দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রক্রিয়া দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্টিভ ম্যাককনেলের মতে, বিষয়টি শুধু কর্মসংস্থানের নয়, এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা দ্রুত কর্মক্ষেত্র ছাড়লে বহু বছরের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান হারিয়ে যেতে পারে। নতুন প্রযুক্তির ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নিরাপদভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। এআই এখনো বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এমন সময়ে অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের বিচক্ষণতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রযুক্তিকে নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে কিছু বিশেষজ্ঞ এ প্রবণতার ইতিবাচক অর্থনৈতিক দিকও দেখছেন। রিটায়ারমেন্ট কোচেস অ্যাসোসিয়েশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা রবার্ট লরা বলেন, ‘অবসরে যাওয়া মানুষ ভ্রমণ, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য খাতে ব্যয় বাড়ান। এতে অর্থনীতিতে নতুন চাহিদা তৈরি হয়। এছাড়া অনেকেই মূল পেশা থেকে অবসর নিলেও অন্য খাতে কাজ করেন বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন।’
অলাভজনক সংগঠন এএআরপির তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালে ৫০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের অর্থনৈতিক অবদান ছিল ১২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০৬০ সালের মধ্যে তা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে প্রযুক্তি শিল্পের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে। তবে এ রূপান্তর সফল করতে নতুন প্রযুক্তির পাশাপাশি অভিজ্ঞ জনশক্তিকে ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ই শিল্পের টেকসই উন্নয়নে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।